ইসলামঃ ধর্ম এবং জীবনব্যবস্থা
সূচনা
‘ইসলাম’ শব্দটি বহুল পরিচিত এবং আলোচিত। ইসলাম সর্বশক্তিমান প্রজ্ঞাময় আল্লাহ তাআলা কর্তৃক নির্ধারিত একটি সার্বজনীন ধর্ম এবং জীবন-ব্যবস্থা। ইসলাম ধর্মের মৌলিক ভিত্তি হলো আল-কোরআন যা বিকশিত এবং প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শেষ নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর সুদীর্ঘ ২৩ বছরের সংগ্রাম-সাধনায়।
ইসলাম ধর্মের সাধারণ বা প্রচলিত ধারণা হলো- ইসলাম শান্তি বা শান্তির ধর্ম, আবার অনেকের কাছে ইসলাম মানে সমর্পণ, অনেকের কাছে ইসলাম মানে অভিবাদন। আর ইসলামের সামষ্ঠিক মানে হলো- ইহা একটি জীবন-ব্যবস্থা বা পুর্নাংগ জীবন-ব্যবস্থা বা দীন- যার মূল বক্তব্য হলো একটি সত্য এবং ন্যায্য জীবন-ব্যাবস্থায় সমর্পনের মাধ্যমে শান্তি লাভ করা।
সমর্পনের মাধ্যমে শান্তি লাভ করা- এই মর্মটি সমাজের প্রায় সবাই মেনে নেয়। একটি দেশের, সমাজের, পরিবারের প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধ, নিয়ম-কানূন, আইন-বিধি যদি সবাই নিজ ইচ্ছায় মেনে নেয় বা অনুসরণ করে তাহলে কি অশান্তি বা বিরোধ থাকে? না থাকার কথা নয়। তবে, শর্ত হলো সমাজের আইন-কানুন বা জীবন বিধান সত্য, ন্যায্য ও কল্যাণকর হতে হবে সবার জন্য। ইসলাম সত্য, কল্যাণ বা ন্যায্যের জীবন বিধান। কারণ, ইসলাম আল্লাহর প্রদত্ত দ্বীন যা অনুসরণ করছে আসমান জমিনের সবাই। আর আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন আসমান-জমিন এবং তার মধ্যে যা আছে- সবকিছু, তিনিই সৃষ্টি করেছেন তাদের প্রকৃতি এবং নীতি বা দ্বীন। আমাদের সৌরজগৎ চলছে তার জন্য নিদৃষ্ট দ্বীনে। সূর্যের চারদিকে গ্রহ, এবং গ্রহের চারদিকে উপগ্রহ ঘুরছে যার যার নিদৃষ্ট এবং নির্ধারিত পথে এবং গতিতে।
আল্লাহ মানুষের জন্য নির্ধারিত করেছেন তার দীন। এতে সমর্পিত হলে শান্তি আসবে- এটাই প্রত্যাশা এবং নিশ্চিত বিশ্বাস। বর্তমান পৃথিবীতে সরকার এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত। রাষ্ট্র গঠিত হয় প্রতিনিধিত্ব আইনের মাধ্যমে। রাষ্ট্র তৈরি করে আইন-কানুন, বিধি-বিধান। উন্নত দেশের মানুষ আইন মান্যকারী, তাই তারা সভ্য, শৃঙ্খল এবং শান্তিপ্রিয়। ইসলাম ধর্মের লোকজনও যদি ইসলামের বিধান বা ব্যবস্থা নিজ থেকে মেনে নেয়, তাহলে তারাও শান্তি এবং প্রগতি লাভ করবে এবং প্রতিষ্ঠিত হবে খেলাফতে-রাশেদুন বা রাশিদুন খেলাফত। এই শান্তি শুধু পৃথিবীতে নয়, মৃত্যুর পরেও অনন্ত জীবনে পাবে শান্তি।
আরবী শব্দ (إِسْلَٰم)/ইসলাম এসেছে আল-কোরআনে মোট ৮ বার (৩:১৯, ৩:৮৫, ৫:৩, ৬:১২৫, ৩৯:২২, ৭১:৭, এবং ৯:৭৪, ৪৯:১৭), যার মধ্যে ইসলামকে একটি দীন, বিশ্বাস, সত্য পথ/জীবনবোধ/দল এবং কল্যাণ বা সুরক্ষা বুঝানো হয়েছে। আয়াত নং ৩:১৯, ৩:৮৫, এবং ৫:৩ সমূহে ইসলামকে দীন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দীন মানে বিচার ব্যাবস্থা (১:৪, ২৪:২৫, ৯৫:৭), আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা (২:১৩২, ২:২৫৬, ৩:৭৩, ৬:১৫৯, ৪০:১৪, ১০৯:৬, ১১০:২), শাসন-ব্যবস্থা (২:১৯৩, ২:২১৭, ৫:৩), পূর্ণাংগ জীবন ব্যবস্থা (৫:৩, ৬১:৯)।
ইসলাম কীঃ তার সংজ্ঞা
আল্লাহ তাআলা ইসলামকে খুব সংক্ষেপে বিস্তারিত সংজ্ঞায়িত করেছেন, ইসলাম আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত একমাত্র জীবন-বিধান বা দীন, যার দলীল এসেছে নিচের তিনটি আয়াতে (৩:১৯, ৩:৮৫ এবং ৫:৩),
اِنَّ الدِّیۡنَ عِنۡدَ اللّٰهِ الۡاِسۡلَامُ ۟ وَ مَا اخۡتَلَفَ الَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡكِتٰبَ اِلَّا مِنۡۢ بَعۡدِ مَا جَآءَهُمُ الۡعِلۡمُ بَغۡیًۢا بَیۡنَهُمۡ ؕ وَ مَنۡ یَّكۡفُرۡ بِاٰیٰتِ اللّٰهِ فَاِنَّ اللّٰهَ سَرِیۡعُ الۡحِسَابِ
“নিশ্চয় আল্লাহর নিকট দীন হচ্ছে ইসলাম। আর যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে, তাদের নিকট জ্ঞান আসার পরই তারা মতানৈক্য করেছে, পরস্পর বিদ্বেষবশত। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর আয়াতসমূহের সাথে কুফরী করে, নিশ্চয় আল্লাহ হিসাব গ্রহণে দ্রুত।” (৩:১৯)। আল্লাহর কাছে মনোনীত একমাত্র দীন হলো ইসলাম। আর এই দীন পূর্ণভাবে বর্ণিত হয়েছে আল-কোরআনের আয়াতসমূহে। আল-কোরআন সর্বশেষ আসমানি কিতাব, এর পূর্বে অনেক কিতাব এসেছিল, রাসূল(সা.) এসেছিলেন যারা আল্লাহর দীনের দাওয়াত দিয়েছিলেন। সকল কিতাব তথা ইসলামের মূলনীতি এক এবং অভিন্ন- (আসমান-জমিনের এক এবং একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, পরিচালনাকারী, রক্ষণাবেক্ষণকারী এবং মীমাংসাকারী রাব্বিল আ-লামিনের প্রতি একনিষ্ট সমর্পণ, ইবাদাত এবং আনুগত্য করণ); তবে প্রেক্ষাপট, সক্ষমতা এবং সময় বিবেচনায় আমলে ও আচারে আছে ভিন্নতা। মানব সমাজে পরিবর্তন একটি চিরন্তন বাস্তবতা বা চালিকা। তাই, আমল এবং কৌশলের ক্ষেত্রে পরিবর্তন ছিল মানব ও রিসালাতের ইতিহাসে। সেই বিবেচনায় এসেছে অনেক রাসুল এবং কিতাব এক অভিন্ন লক্ষ্যে।
ইসলাম যেহেতু সার্বজনীন ধর্ম বা ব্যবস্থা, তাই এতে মূলনীতিই প্রথমে বিবেচ্য, আমল বা কর্ম ও আচার নয়। আমল হলো আপেক্ষিক, মূলনীতি বা ঈমান হলো স্থায়ী এবং সার্বজনীন। সুতরাং বিভিন্ন রাসূলের উম্মতদের মধ্যে কোনো বিরোধ বা অনৈক্য বা সরলরেখার বক্রতা থাকার কথা নয়। রাসুলগণ ধর্ম বা দীন প্রচারক, উদ্ভাবক নন। দীন আল্লাহর, আমল এবং হিকমা রাসূলের। তাই, ইসলাম নামক আল্লাহর দীন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নাম ধারণ করেছে তাদের নবী বা গোত্র বিবেচনায়। ইহুদি ধর্ম নাম নিয়েছে ইহুদি জাতি থেকে, খ্রীষ্টান ধর্ম এসেছে নব জেসাস খ্রীষ্ট থেকে। তারা আল্লাহর দীন ইসলামের মৌলিক নীতির পরিবর্তন এনেছিল। তাই এগুলো আল্লাহর দীনের রূপ হারিয়েছে। আর এই ভিন্নতার মূল কারণ হলো মানুষের ইগো বা বিদ্বেষ। তাই, উপরের আয়াতে ইহা পরিস্কার যে, আল্লাহর আয়াত বা জ্ঞান আসার পর মতানৈক্য, বিদ্বেষ এবং কুফুরি করা- ইসলাম তথা দ্বীনের পরিপন্থী। আল্লাহ ফ্যাসাদ, বিদ্বেষ এবং কুফুরি পছন্দ করেন না। এগুলো তাঁর মহান দ্বীনের অংশ নয়। ইসলাম হলো আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত সার্বজনীন জীবন-বিধান যা শৃঙ্খলা যা প্রগতি, মীমাংসা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা করে।
প্রতিটি মানুষের এবং মানবসমাজ বা সম্প্রদায়ের রয়েছে জীবন ধারণের নিজস্ব রীতি, পদ্ধতি, মূল্যবোধ, বিধান যা তার আল্লাহ প্রদত্ত চিন্তা তথা ইচ্ছাশক্তির প্রকাশ। আর তা যুগেযুগে বিবর্তিত হয়েছেঃ সৃষ্টি হয়েছে ভিন্নতার। অন্যদিকে, মানুষ পৃথিবীতে আসে শুণ্য জ্ঞান নিয়ে, এমনকি সে কথাও বলতে পারে না। তাকে দিতে হয় ভাষা শিক্ষা এবং জ্ঞান-প্রদান। তার জন্য আল্লাহ মানুষের জন্য পাঠান শিক্ষক এবং কিতাব- যে শিক্ষা এক আল্লাহর নীতি এবং বিধান প্রতিষ্ঠা করে মানব সমাজে সার্বজনীন সাম্য, শৃঙ্খলা, শাসন ও সাম্য নিশ্চিত করে। মানুষ তার ব্যক্তিত্বে এবং ইগোতে ভিন্ন- সে তার নিজ সত্তা, পরিবার বা সম্প্রদায়ের ইজ্জতের, লাভে চলতে চায়। অধিকন্তু, মানুষ দেখে তার পার্থিব ও ক্ষণিকের লক্ষ্য। মানুষ চায় ভোগ করতে, নিজের প্রবৃত্তিকে সন্তুষ্ট করতে। মানুষের বিবেক-বিবেচনা বা বোধশক্তি আছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষের বোধশক্তি তার প্রবৃত্তির কাছে হারিয়ে যায়। তাই, আল্লাহ মানুষের সার্বিক কল্যাণে তাঁর দীনের বাহিরে অন্য কোনো ধর্ম বা জীবনবিধান মেনে নেন না; তাই যৌক্তিক, যা এসেছে নিচের আয়াতে,
وَ مَنۡ یَّبۡتَغِ غَیۡرَ الۡاِسۡلَامِ دِیۡنًا فَلَنۡ یُّقۡبَلَ مِنۡهُ ۚ وَ هُوَ فِی الۡاٰخِرَۃِ مِنَ الۡخٰسِرِیۡنَ
“আর যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দ্বীন চায় তবে তার কাছ থেকে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (৩:৮৫)। অর্থাৎ, ইসলাম আল্লাহ প্রদত্ত এবং অনুমোদিত একমাত্র জীবিন বিধান। এটা যদি কেউ না মানে তাহলে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে এখানে আল্লাহ বলেননি যে, অন্য দীন অনুসরণ করলে দুনিয়াতেই ক্ষতিগ্রস্থ হবে। মানুষের দীন বা উদ্ভাবিত দীন যে একেবারেই খারাপ তা নয়, বা বুঝানো হয়নি। যেমন পরিশ্রম করে পবিত্র রিজিক অর্জন, সত্য কথা বলা, পিতামাতার সেবা, বিনয়ী বা ভদ্র ব্যবহার করা ইত্যাদি সকল মানব সমাজ অনুসরণ করে বা করার চেষ্টা করে। এগুলো আল্লাহর দীনের অন্তর্ভুক্ত এবং অংশ। কিন্তু আল্লাহ চান পূর্ণ দীন, যার ভিত্তি হলো মানুষের আমিত্ব সমর্পণ- এই ভেবে যে, তার দেহ, জীবন, রিজিক, ভোগ, জ্ঞান বা ক্ষমতা আল্লাহ প্রদত্ত, এর জন্য তাদের আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা একান্তই উচিত; এবং এই ভেবে যে, তার জ্ঞান যথার্থ এবং সম্পূর্ণ নয়, কারণ সে অদৃশ্যকে দেখতে পায় না। অথচ আল্লাহ তাআলা সকল প্রকাশ্য এবং গোপন (অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ) জ্ঞানের অধিকারী; সুতরাং মানুষের অহংকার করার কিছুই নেই। তবে, অন্য দীন অনুসরণকারিদের জন্য (আল্লাহর দীনের সাথে মিলে এমন কর্ম) দুনিয়ার জীবনে অবকাশ রয়েছে, এবং তাদের ভালো কর্মের জন্য দুনিয়াতে প্রতিদান রয়েছে। কিন্তু আখিরাত বা চূড়ান্ত বিচারের দিনে তারা ক্ষতিগ্রস্থ হবে, কারণ তারা অদৃশ্য সত্তা আল্লাহ এবং তার বিচার দিবস আখিরাতে তারা ঈমান আনে না। বলা আবশ্যিক যে আল্লাহর দীনের অবিচ্ছেদ্য এবং কেন্দ্রীয় বিষয় হলো আখিরাত বা মীমাংসা দিবস। সুতরাং, মানুষ নিজেকে যতই মানবিক, জ্ঞানী এবং ক্ষমতাবান মনে করুক, আল্লাহর দীনের মূলনীতি (এক আল্লাহর আনুগত্য এবং তার শেষ বিচার বা আখিরাত) এর উপর ঈমান না আনা পর্যন্ত তাদের দীনকে মেনে নিবেন না, এবং আখিরাতে তাদের কোনো অর্জন থাকবেনা - এটাই তার বিধান যা তিনি মানুষকে বারবার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছেন। অর্থাৎ ইসলাম আখিরাতমুখী দীন, যা দুনিয়াতে কল্যাণ এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্টা করে।
যেহেতু ইসলাম সার্বজনীন, তাই আমলের ক্ষেত্রে এটাকে করা হয়েছে ব্যক্তি এবং পরিস্থিতিবান্ধব, যার প্রমাণ এসেছে নিচের আয়াতে-
حُرِّمَتۡ عَلَیۡكُمُ الۡمَیۡتَۃُ وَ الدَّمُ وَ لَحۡمُ الۡخِنۡزِیۡرِ وَ مَاۤ اُهِلَّ لِغَیۡرِ اللّٰهِ بِهٖ وَ الۡمُنۡخَنِقَۃُ وَ الۡمَوۡقُوۡذَۃُ وَ الۡمُتَرَدِّیَۃُ وَ النَّطِیۡحَۃُ وَ مَاۤ اَكَلَ السَّبُعُ اِلَّا مَا ذَكَّیۡتُمۡ ۟ وَ مَا ذُبِحَ عَلَی النُّصُبِ وَ اَنۡ تَسۡتَقۡسِمُوۡا بِالۡاَزۡلَامِ ؕ ذٰلِكُمۡ فِسۡقٌ ؕ اَلۡیَوۡمَ یَئِسَ الَّذِیۡنَ كَفَرُوۡا مِنۡ دِیۡنِكُمۡ فَلَا تَخۡشَوۡهُمۡ وَ اخۡشَوۡنِ ؕ اَلۡیَوۡمَ اَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِیۡنَكُمۡ وَ اَتۡمَمۡتُ عَلَیۡكُمۡ نِعۡمَتِیۡ وَ رَضِیۡتُ لَكُمُ الۡاِسۡلَامَ دِیۡنًا ؕ فَمَنِ اضۡطُرَّ فِیۡ مَخۡمَصَۃٍ غَیۡرَ مُتَجَانِفٍ لِّاِثۡمٍ ۙ فَاِنَّ اللّٰهَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত ও শূকরের গোশত এবং যা আল্লাহ ভিন্ন কারো নামে যবেহ করা হয়েছে; গলা চিপে মারা জন্তু, প্রহারে মরা জন্তু, উঁচু থেকে পড়ে মরা জন্তু অন্য প্রাণীর শিঙের আঘাতে মরা জন্তু এবং যে জন্তুকে হিংস্র প্রাণী খেয়েছে- তবে যা তোমরা যবেহ করে নিয়েছ তা ছাড়া, আর যা মূর্তি পূঁজার বেদিতে বলি দেয়া হয়েছে এবং জুয়ার তীর দ্বারা বণ্টন করা হয়, এগুলো গুনাহ। যারা কুফরী করেছে, আজ তারা তোমাদের দীনের ব্যাপারে হতাশ হয়ে পড়েছে। সুতরাং তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, বরং আমাকে ভয় কর। আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নিআমত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দীন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে। তবে যে তীব্র ক্ষুধায় বাধ্য হবে, কোন পাপের প্রতি ঝুঁকে নয় (তাকে ক্ষমা করা হবে), নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (৫:৩)। এখানে, আল্লাহর নামে কুরবানী বা যবেহ ছাড়া অন্যভাবে প্রাপ্ত গোশত, আল্লাহ ব্যতীত অন্য ইলাহ বা প্রভুর নামে বলি দেওয়া পশুর গোশত ভক্ষণ এবং পরিশ্রম ছাড়া অর্জিত রিজিক অর্জনকে গুনাহের কাজ মর্মে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ, দীনের অন্যতম মৌলিক বিধান হলো রিজিকের বিধান। তবে, এখানে আল্লাহ মানুষের জন্য দীনকে সহজ করেছেন- তীব্র ক্ষুধায় আক্রান্ত হলে, পাপের বা লোভের বশবর্তী না হয়ে ভক্ষণ করলে আল্লাহ ক্ষমা করার ব্যাপারে অবহিত করছেন। আল্লাহর বিধান হক বা ন্যায্যতার উপর প্রতিষ্ঠিত। যেহেতু তিনি প্রতিটি প্রাণের স্রষ্টা, সুতরাং জীবের প্রাণহরণ আল্লাহর নামে বা অনুমতিতেই হবে- এটাই ন্যায্য।
আর আল্লাহ এই পূর্ণ এবং চূড়ান্ত বিকাশিত দীন যা হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর রিসালাত এবং খেলাফতের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেছেন- তাতে দাখিল হতে নির্দেশ দিয়েছেন, যা বর্ণিত হয়েছে নিচের আয়াতে,
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا ادۡخُلُوۡا فِی السِّلۡمِ كَآفَّۃً ۪ وَ لَا تَتَّبِعُوۡا خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ ؕ اِنَّهٗ لَكُمۡ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ
“হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু।” (২:২০৮)। অর্থাৎ, ইসলামের শুরু হবে ঈমান থেকে এবং দাখিল হতে হবে পূর্ণভাবে। এখানে উল্লেখিত সিলম (سِّلْم) দিয়ে তিনটি বিষয় পরিষ্কার করা হয়েছে- যা আল্লাহর অপরিসীম, অকল্পনীয় এবং অতুলণীয় প্রাজ্ঞতার স্বাক্ষর। প্রথমত ইসলাম ((إِسْلَٰم) একটি সাধারণ ক্রিয়া বিশেষ্য যার ক্রিয়াপদ হচ্ছে আসলামা ((أَسْلَمَ) বা সমর্পণ, অন্যদিকে সিলম (سِّلْم) বা ইসলাম হলো সুনিদৃষ্ট নাম বিশেষ্য বা আল-কোরআনিক বা মোহাম্মদি ইসলাম মর্মে বুঝানো হয়েছে। কারণ আল্লাহর প্রেরিত সকল রাসূলের প্রতি ইসলাম দীনই প্রেরিত হয়েছে। ২য় হচ্ছে, ইসলামে দাখিল হতে হলে আগেই আনতে হবে ঈমান। ৩য় বিষয় হচ্ছে (سِّلْم) শব্দটি উৎপত্তি হয়েছে সালাম (سَلَٰم) এবং সালম (سَّلْم) যাদের অর্থ হলো শান্তি। এই শব্দটি উদ্ভুত হয়েছে সালাম (سَلَم) থেকেও তিনটি অর্থ বা মর্ম বুঝাতে (৪:৯০, ৪:৯১- শান্তি; ১৬:২৮, ১৬:৮৭- সমর্পণ এবং ৩৯:২৯- একনিষ্টতা বা পরম আন্তরিকতার সাথে পূর্ণভাবে ধারণ বা আনুগত্য করা বুঝাতে), যার প্রমাণ রয়েছে নিচের ৫টি আয়াতে,
اِلَّا الَّذِیۡنَ یَصِلُوۡنَ اِلٰی قَوۡمٍۭ بَیۡنَكُمۡ وَ بَیۡنَهُمۡ مِّیۡثَاقٌ اَوۡ جَآءُوۡكُمۡ حَصِرَتۡ صُدُوۡرُهُمۡ اَنۡ یُّقَاتِلُوۡكُمۡ اَوۡ یُقَاتِلُوۡا قَوۡمَهُمۡ ؕ وَ لَوۡ شَآءَ اللّٰهُ لَسَلَّطَهُمۡ عَلَیۡكُمۡ فَلَقٰتَلُوۡكُمۡ ۚ فَاِنِ اعۡتَزَلُوۡكُمۡ فَلَمۡ یُقَاتِلُوۡكُمۡ وَ اَلۡقَوۡا اِلَیۡكُمُ السَّلَمَ ۙ فَمَا جَعَلَ اللّٰهُ لَكُمۡ عَلَیۡهِمۡ سَبِیۡلًا
“তবে (তাদেরকে হত্যা করো না) যারা মিলিত হয় এমন কওমের সাথে, যাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সন্ধিচুক্তি রয়েছে। অথবা তোমাদের কাছে আসে এমন অবস্থায় যে, তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে কিংবা তাদের কওমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে তাদের মন সঙ্কুচিত হয়ে গিয়েছে। আর আল্লাহ চাইলে অবশ্যই তাদেরকে তোমাদের উপর ক্ষমতা দিতে পারতেন। অতঃপর নিশ্চিতরূপে তারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত। অতএব তারা যদি তোমাদের থেকে সরে যায় অতঃপর তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে এবং তোমাদের কাছে শান্তি প্রস্তাব উপস্থাপন করে, তাহলে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাদের বিরুদ্ধে কোন পথ রাখেননি।” (৪:৯০)।
سَتَجِدُوۡنَ اٰخَرِیۡنَ یُرِیۡدُوۡنَ اَنۡ یَّاۡمَنُوۡكُمۡ وَ یَاۡمَنُوۡا قَوۡمَهُمۡ ؕ كُلَّمَا رُدُّوۡۤا اِلَی الۡفِتۡنَۃِ اُرۡكِسُوۡا فِیۡهَا ۚ فَاِنۡ لَّمۡ یَعۡتَزِلُوۡكُمۡ وَ یُلۡقُوۡۤا اِلَیۡكُمُ السَّلَمَ وَ یَكُفُّوۡۤا اَیۡدِیَهُمۡ فَخُذُوۡهُمۡ وَ اقۡتُلُوۡهُمۡ حَیۡثُ ثَقِفۡتُمُوۡهُمۡ ؕ وَ اُولٰٓئِكُمۡ جَعَلۡنَا لَكُمۡ عَلَیۡهِمۡ سُلۡطٰنًا مُّبِیۡنًا
“অচিরেই তোমরা কতক লোককে এমনও পাবে, যারা তোমাদের কাছ থেকেও নিরাপদ থাকতে চায়, তাদের নিজ সম্প্রদায় থেকেও নিরাপদ থাকতে চায়, যখন তাদেরকে ফিতনার দিকে মনোনিবেশ করানো হয় তখন তাতেই জড়িয়ে পড়ে। কাজেই যদি তারা তোমাদের শত্রুতা হতে সরে না যায় এবং তোমাদের নিকট শান্তি প্রস্তাব না করে এবং তাদের হস্ত সংবরণ না করে, তবে তাদেরকে গ্রেফতার কর আর যেখানেই পাও হত্যা কর, এরাই হচ্ছে সেই সব লোক তোমাদেরকে যাদের বিরুদ্ধাচরণের স্পষ্ট অধিকার দিয়েছি।” (৪:৯১)।
الَّذِیۡنَ تَتَوَفّٰىهُمُ الۡمَلٰٓئِكَۃُ ظَالِمِیۡۤ اَنۡفُسِهِمۡ ۪ فَاَلۡقَوُا السَّلَمَ مَا كُنَّا نَعۡمَلُ مِنۡ سُوۡٓءٍ ؕ بَلٰۤی اِنَّ اللّٰهَ عَلِیۡمٌۢ بِمَا كُنۡتُمۡ تَعۡمَلُوۡنَ
“নিজদের উপর যুলমকারী থাকা অবস্থায় ফেরেশতারা যাদের মৃত্যু ঘটাবে। অতঃপর তারা সমর্পণ করে বলবে, ‘আমরা কোন পাপ করতাম না।’ হ্যাঁ, নিশ্চয় তোমরা যা করতে সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক জ্ঞাত।” (১৬:২৮)। (১৬:৮৮)। এখানে পূর্ণ সমর্পণ বা আত্মসমর্পণ করা বুঝানো হয়েছে।
ضَرَبَ اللّٰهُ مَثَلًا رَّجُلًا فِیۡهِ شُرَكَآءُ مُتَشٰكِسُوۡنَ وَ رَجُلًا سَلَمًا لِّرَجُلٍ ؕ هَلۡ یَسۡتَوِیٰنِ مَثَلًا ؕ اَلۡحَمۡدُ لِلّٰهِ ۚ بَلۡ اَكۡثَرُهُمۡ لَا یَعۡلَمُوۡنَ “আল্লাহ একটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন: এক ব্যক্তি যার মনিব অনেক, যারা পরস্পর বিরোধী; এবং আরেক ব্যক্তি, যে এক মনিবের অনুগত, এ দু’জনের অবস্থা কি সমান? সকল প্রশংসা আল্লাহর; কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না।” (৩৯:২৯) । সোবহানাল্লাহ। আল্লাহ তাআলা অতি সংক্ষেপে এক আয়াতে বিস্তারিত এবং পূর্ণ সংজ্ঞা দিয়েছেন সূরা আল-বাকারার ২০৮ নম্বর (২:২০৮) আয়াতে- এক এবং একমাত্র, লা-শারীক আল্লাহর প্রতি একনিষ্টভাবে সমর্পিত হয়ে আল-কোরআন এবং রাসুল (সা.) এর পূর্ণ অনূসরণের মাধ্যমে দুনিয়া এবং আখিরাতে শান্তি লাভ করার জীবনবিধানকেই ইসলাম বলা হয়।
ইসলাম মানুষের দৈহিক ও মানসিক বিশুদ্ধতা, আচরণ এবং আমলের দীন। তবে, এতে মূলনীতি তথা মানসিক পরিশুদ্ধতা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। বলতে গেলে, ইসলামের ভিত্তি হলো মানসিকতা। মানুষের মানসিকতা গড়ে উঠে তার ঈমান বা বিশ্বাস এবং শিক্ষা থেকে, যা তাকে তার করণীয়-বর্জণীয় জানিয়ে দেয় এবং আনুগত্য-অনুসরণ করতে আগ্রহী বা বাধ্য করে তুলে। তাই, ইসলামের জন্য অন্তরের প্রসস্ততা বা কাঠামো অত্যাবশ্যক।
ঈমান বা মূলনীতি প্রোথিত হয় বা থাকে ছদর বা অন্তরে। ইসলামের ভিত্তি হল বিশ্বাস, জ্ঞান, যুক্তি এবং প্রত্যয়। প্রতিটি মানব শিশু জন্ম গ্রহণ করে এমন অবস্থায় যে তার কোন জ্ঞানই থাকে না। সে সব শিখে নেয় ক্রমে ক্রমে। প্রতিটি মানুষের অন্তরে জন্ম নেয় ঈমান বা বিশ্বাস, জ্ঞান এবং বোধশক্তি যা দিয়ে সে কাজ করে। ইসলাম ধারণ করতে প্রয়োজন মনের বা অন্তরের স্মৃতি বা ধারনশক্তি। এই ধারণশক্তির অভাব বা বাধা থাকলে আল্লাহ তা সম্প্রসারণ/উম্মুক্ত করে করে দেন। আল্লাহ অন্তরে দিয়েছেন কলব বা আকল বা বুদ্ধি-বিবেচনা শক্তি যা দ্বারা মানুষ তাঁর এবং স্রষ্টার প্রকৃতিকে বুঝতে পারে। সুতরাং ইসলামে তারাই দাখিল হতে পারে যাদের অন্তরকে আল্লাহ সত্য গ্রহণের জন্য উম্মুক্ত করে দেন, যার প্রমাণ এসেছে নিচের আয়াতে,
فَمَنۡ یُّرِدِ اللّٰهُ اَنۡ یَّهۡدِیَهٗ یَشۡرَحۡ صَدۡرَهٗ لِلۡاِسۡلَامِ ۚ وَ مَنۡ یُّرِدۡ اَنۡ یُّضِلَّهٗ یَجۡعَلۡ صَدۡرَهٗ ضَیِّقًا حَرَجًا كَاَنَّمَا یَصَّعَّدُ فِی السَّمَآءِ ؕ كَذٰلِكَ یَجۡعَلُ اللّٰهُ الرِّجۡسَ عَلَی الَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ ﴾ “সুতরাং যাকে আল্লাহ হিদায়াত করতে চান, ইসলামের জন্য তার বুক উন্মুক্ত/প্রসারিত করে দেন। আর যাকে ভ্রষ্ট করতে চান, তার বুক সঙ্কীর্ণ-সঙ্কুচিত করে দেন, যেন সে আসমানে আরোহণ করছে। এমনিভাবে আল্লাহ অকল্যাণ দেন তাদের উপর, যারা ঈমান আনে না।” (৬:১২৫)। এখানে, উল্লেখিত বুক/অন্তর যার আরবী শব্দ (صَدْر)/সাদর যা প্রসস্ত (شَرَحَ)/শারাহা , এবং সঙ্কুচিত (ضَيِّق)/দায়্যিক ও হারাজ/(حَرَج) সঙ্কুচিত (আশাহত) হতে পারে। শারাহা, দায়্যিক, হারাজ; এই তিনটি শব্দ দিয়েই মন বা সাদরকে প্রসারিত বা সঙ্কুচিত করা বুঝানো হয়েছে আল-কোরআনে। মানুষের অন্তরে থাকে লোভ-লালসা, হিংসা-রাগ ইত্যাদি যা মানুষকে শান্তি স্থাপনে বাধা দেয়। আর এই মন্দ বা দুনিয়াবি দিকগুলোকে পরিবর্তন বা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য দরকার মানষিক শিক্ষা যা ধারণ করতে অন্তরের বা জ্ঞানের প্রসস্ততা থাকতে হয়। এই শারাহ একটি মানসিক প্রক্রিয়া যা আল্লাহ্র প্রদত্ত রুহের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়। তাই, আল্লাহর রাসূলগণ তাঁদের অন্তরের প্রশস্ততার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া চাইতেন। অন্যদিকে, যাদের অন্তরে ইসলাম নেই, তাদের অন্তর এতোটাই সঙ্কুচিত হয়য় যে তারা শুন্যে ভেসে বেড়ায়। প্রথিবী প্রতিটি ভরকেই তার কেন্দ্রের দিকে আকর্ষণ করে, কিন্তু কোন বস্তুর কণা যখন এত ক্ষুদ্র হয় বা এতোটা সংকোচনের চাপে পড়ে তখন বাতাসে বা শুন্যে ভেসে বেড়ায়। তাদের অন্তর তখন আল্লাহ তথা সত্যের জমিনে কোনো স্থান পায় না। মানুষ যখন যুদ্ধে বা জীবন যুদ্ধে হেরে যায়, চারিদিকে বিপদ, হতাশা দেখতে পায়, তখন সে তার মনে বা জমিনে বিচরণ করার কোন ক্ষেত্র খুঁজে পায় না। তখন সে আকাশে উড়ে যেতে চায় বা হারিয়ে যেতে চায়। একই মর্ম ফূটে উঠেছে নিচের আয়াতে,
اَفَمَنۡ شَرَحَ اللّٰهُ صَدۡرَهٗ لِلۡاِسۡلَامِ فَهُوَ عَلٰی نُوۡرٍ مِّنۡ رَّبِّهٖ ؕ فَوَیۡلٌ لِّلۡقٰسِیَۃِ قُلُوۡبُهُمۡ مِّنۡ ذِكۡرِ اللّٰهِ ؕ اُولٰٓئِكَ فِیۡ ضَلٰلٍ مُّبِیۡنٍ
“আল্লাহ ইসলামের জন্য যার বক্ষ খুলে দিয়েছেন ফলে সে তার রবের পক্ষ থেকে নূরের উপর রয়েছে, (সে কি তার সমান, যে এরূপ নয়?) অতএব ধ্বংস সে লোকদের জন্য যাদের হৃদয় কঠিন হয়ে গেছে আল্লাহর স্মরণ থেকে। তারা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে নিপতিত।” (৩৯:২২)। ইসলামের ভিত্তি হলো জ্ঞান/নূর/আলো (نُوۡرٍ), অন্তরের প্রসস্ততা, উদারতা, ধৈর্য ধারণ করার সক্ষমতা। ইসলামের আলো দেখিয়ে দেয় সঠিক পথ, যে পথ বেয়ে শুধু পার্থিব দুনিয়া নয়, পৌঁছা যায় আখিরাত তথা সাত আসমানের উপর প্রতিষ্ঠিত আল্লাহ এবং তাঁর আরশের কাছে।
নিষ্ঠুরতা, গোঁড়ামি, মীমাংসা না করার প্রবনতা ইসলামের নীতি নয়। ইসলাম মানে আল্লাহকে স্মরণ। আল্লাহর স্মরণ মানে আল্লাহর রহমত এবং আলো বা হেদায়েতের মধ্যে বিচরণ। পৃথিবী যেমন তার চারদিকের প্রতিটি বস্তুকণাকে তার অভিকর্ষীয় বল দিয়ে তাঁর কেন্দ্রের দিকে আকর্ষন করে তাকে তার স্পেসে ধরে রাখে, তেমনি আল্লাহর স্মরণ এর মাধ্যমে প্রাপ্ত রহমত এবং আলো মানুষকে আল্লাহর দিকে টেনে রাখে।
ইসলাম কেন? কার জন্য ইসলাম দীন। আল্লাহ কেন মানুষের দীনকে মেনে নেয় নাই। কারণ আল্লাহ আসমান-জমিনের স্রষ্টা, মালিক এবং পালনকর্তা; তিনি সর্বশক্তিমান, প্রকাশ্য এবং গোপন জ্ঞানের অধিকারী; তিনিই সবচেয়ে প্রাজ্ঞ বিধানদাতা এবং মীমাংসাকারী; তিনিই শান্তি এবং কল্যাণকারী। তাই, ইসলাম আল্লাহর কল্যণে নয়, বরং মানুষের কল্যাণে, যা এসেছে নিচের আয়াতে,
یَمُنُّوۡنَ عَلَیۡكَ اَنۡ اَسۡلَمُوۡا ؕ قُلۡ لَّا تَمُنُّوۡا عَلَیَّ اِسۡلَامَكُمۡ ۚ بَلِ اللّٰهُ یَمُنُّ عَلَیۡكُمۡ اَنۡ هَدٰىكُمۡ لِلۡاِیۡمَانِ اِنۡ كُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ
“(তারা মনে করে) ‘তারা ইসলাম গ্রহণ করে তোমাকে ধন্য করেছে’। বল, ‘তোমরা ইসলাম গ্রহণ করে আমাকে ধন্য করেছ মনে করো না’। বরং আল্লাহই তোমাদেরকে ঈমানের দিকে পরিচালিত করে তোমাদেরকে ধন্য করেছেন, তোমরা যদি সত্যবাদী হয়ে থাক’।” (৪৯:১৭)। আর ইসলাম গ্রহণ করা মানে আল্লাহকে ধন্য বা করুণা করা নয়, বরং নিজের কল্যাণ সাধন করা। বরং ইসলাম গ্রহণ করলে মানুষের মধ্যে সত্য-ঈমান প্রোথিত হবে এবং আল্লাহর সাহায্য এবং হেদায়েত প্রাপ্তির মাধ্যমে সফলতার পথে এগুতে পারবে। ঈমান কী শক্তি তা বুঝা যায় পরিবার বা সংসার দেখে। যে পরিবারে মা-বাবা দুজনের মধ্যে ঈমান বা বিশ্বাস কাজ করে না, তাতে কি কল্যাণ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়? পারস্পরিক আস্থা থাকলে যত কষ্ট, আপদ-বিপদ, বাধা আসুক তা পার হওয়া যায় সহজে।
সূরা আস-সফ’এর ৭ নং আয়াতে ইসলামকে সত্য পথ, মত এবং জীবনবোধ হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে। ইসলাম সত্যের উপর প্রতিষ্টিত। ইসলামের মূল হলো এক আল্লাহ সম্পর্কে সত্য জানা ও তাতে বিশ্বাস, সমর্পণ এবং আনুগত্য, যা এসেছে নিচের আয়াতে,
وَ مَنۡ اَظۡلَمُ مِمَّنِ افۡتَرٰی عَلَی اللّٰهِ الۡكَذِبَ وَ هُوَ یُدۡعٰۤی اِلَی الۡاِسۡلَامِ ؕ وَ اللّٰهُ لَا یَهۡدِی الۡقَوۡمَ الظّٰلِمِیۡنَ
“সেই ব্যক্তির চেয়ে অধিক যালিম আর কে? যে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা রচনা করে, অথচ তাকে ইসলামের দিকে আহবান করা হয়। আর আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।” (৬১:৭)। ইসলামের মূল হলো আল্লাহর একক প্রভুত্বে সমর্পণ, যেই প্রভুত্বে রয়েছে হক এবং কল্যাণ। আর এর বাহিরে রয়েছে মিথ্যা, জুলুম, অন্যায্যতা এবং অকল্যাণ। ইসলাম শুধু জ্ঞান নয়, ইহা প্রকৃত সত্য জ্ঞান, সহজ-সরল পথ।
ইসলামে দাখিল হওয়া মানে দুনিয়া এবং আখিরাতে সুরক্ষা পাওয়া; রিজিকের সুরক্ষা, ইজ্জতের সুরক্ষা এবং আযাব থেকে সুরক্ষা। যারা ইসলাম ত্যাগ করে তাঁদের জন্য কোন সাহায্য ও সুরক্ষা নেই। ইসলাম গ্রহণ করলে পাওয়া যায় নিশ্চিত সুরক্ষা। মানুষ ভুল করতে পারে, পরিবর্তন হতে পারে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে। ইসলামে আল্লাহ রেখেছেন তওবার মহান বিধান, যা মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে ইসলামের পথে, যা বর্ণিত হয়েছে নিচের আয়াতে,
یَحۡلِفُوۡنَ بِاللّٰهِ مَا قَالُوۡا ؕ وَ لَقَدۡ قَالُوۡا كَلِمَۃَ الۡكُفۡرِ وَ كَفَرُوۡا بَعۡدَ اِسۡلَامِهِمۡ وَ هَمُّوۡا بِمَا لَمۡ یَنَالُوۡا ۚ وَ مَا نَقَمُوۡۤا اِلَّاۤ اَنۡ اَغۡنٰهُمُ اللّٰهُ وَ رَسُوۡلُهٗ مِنۡ فَضۡلِهٖ ۚ فَاِنۡ یَّتُوۡبُوۡا یَكُ خَیۡرًا لَّهُمۡ ۚ وَ اِنۡ یَّتَوَلَّوۡا یُعَذِّبۡهُمُ اللّٰهُ عَذَابًا اَلِیۡمًا ۙ فِی الدُّنۡیَا وَ الۡاٰخِرَۃِ ۚ وَ مَا لَهُمۡ فِی الۡاَرۡضِ مِنۡ وَّلِیٍّ وَّ لَا نَصِیۡرٍ
“তারা আল্লাহর কসম করে যে, তারা বলেনি, অথচ তারা কুফরী বাক্য বলেছে এবং ইসলাম গ্রহণের পর কুফরী করেছে। আর মনস্থ করেছে এমন কিছুর যা তারা পায়নি। আর তারা একমাত্র এ কারণেই দোষারোপ করেছিল যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তাঁর স্বীয় অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করেছেন। এরপর যদি তারা তাওবা করে, তবে তা হবে তাদের জন্য উত্তম, আর যদি তারা বিমুখ হয়, আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে বেদনাদায়ক আযাব দেবেন, আর তাদের জন্য যমীনে নেই কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী।” (৯:৭৪)। কল্যাণের প্রশ্নে ইসলাম কোনো অপশন নয়, বরং বাধ্যবাধকতা। ইসলাম গ্রহণ করলে কল্যাণ এবং সফলতা। আর সফলতা মানে আল্লাহর কাছে সফলভাবে ইজ্জতের সাথে প্রত্যাবর্তন করা, আর ব্যার্থতা হলো ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তন করা। মানুষকে আল্লাহর নিকট প্রত্যাবর্তন করতেই হবে। এতে কোনো ব্যতিক্রম নেই।
ইসলাম শব্দের সাথে উৎপত্তি বা মর্মার্থ বিবেচনায় সম্পর্ক আছে দুটি শব্দের; (أَسْلَمَ)/আসলামা এবং (سَلَٰم)/সালাম যাদের অর্থ যথাক্রমে ‘সমর্পণ করা’ এবং ‘শান্তি’। এই শব্দগুলোর সাথে ইসলামের সম্পর্ক পরবর্তী অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে, ইনশাআল্লাহ।
ইসলাম ধর্মের সাধারণ বা প্রচলিত ধারণা হলো- ইসলাম শান্তি বা শান্তির ধর্ম, আবার অনেকের কাছে ইসলাম মানে সমর্পণ, অনেকের কাছে ইসলাম মানে অভিবাদন। আর ইসলামের সামষ্ঠিক মানে হলো- ইহা একটি জীবন-ব্যবস্থা বা পুর্নাংগ জীবন-ব্যবস্থা বা দীন- যার মূল বক্তব্য হলো একটি সত্য এবং ন্যায্য জীবন-ব্যাবস্থায় সমর্পনের মাধ্যমে শান্তি লাভ করা।
সমর্পনের মাধ্যমে শান্তি লাভ করা- এই মর্মটি সমাজের প্রায় সবাই মেনে নেয়। একটি দেশের, সমাজের, পরিবারের প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধ, নিয়ম-কানূন, আইন-বিধি যদি সবাই নিজ ইচ্ছায় মেনে নেয় বা অনুসরণ করে তাহলে কি অশান্তি বা বিরোধ থাকে? না থাকার কথা নয়। তবে, শর্ত হলো সমাজের আইন-কানুন বা জীবন বিধান সত্য, ন্যায্য ও কল্যাণকর হতে হবে সবার জন্য। ইসলাম সত্য, কল্যাণ বা ন্যায্যের জীবন বিধান। কারণ, ইসলাম আল্লাহর প্রদত্ত দ্বীন যা অনুসরণ করছে আসমান জমিনের সবাই। আর আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন আসমান-জমিন এবং তার মধ্যে যা আছে- সবকিছু, তিনিই সৃষ্টি করেছেন তাদের প্রকৃতি এবং নীতি বা দ্বীন। আমাদের সৌরজগৎ চলছে তার জন্য নিদৃষ্ট দ্বীনে। সূর্যের চারদিকে গ্রহ, এবং গ্রহের চারদিকে উপগ্রহ ঘুরছে যার যার নিদৃষ্ট এবং নির্ধারিত পথে এবং গতিতে।
আল্লাহ মানুষের জন্য নির্ধারিত করেছেন তার দীন। এতে সমর্পিত হলে শান্তি আসবে- এটাই প্রত্যাশা এবং নিশ্চিত বিশ্বাস। বর্তমান পৃথিবীতে সরকার এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত। রাষ্ট্র গঠিত হয় প্রতিনিধিত্ব আইনের মাধ্যমে। রাষ্ট্র তৈরি করে আইন-কানুন, বিধি-বিধান। উন্নত দেশের মানুষ আইন মান্যকারী, তাই তারা সভ্য, শৃঙ্খল এবং শান্তিপ্রিয়। ইসলাম ধর্মের লোকজনও যদি ইসলামের বিধান বা ব্যবস্থা নিজ থেকে মেনে নেয়, তাহলে তারাও শান্তি এবং প্রগতি লাভ করবে এবং প্রতিষ্ঠিত হবে খেলাফতে-রাশেদুন বা রাশিদুন খেলাফত। এই শান্তি শুধু পৃথিবীতে নয়, মৃত্যুর পরেও অনন্ত জীবনে পাবে শান্তি।
আরবী শব্দ (إِسْلَٰم)/ইসলাম এসেছে আল-কোরআনে মোট ৮ বার (৩:১৯, ৩:৮৫, ৫:৩, ৬:১২৫, ৩৯:২২, ৭১:৭, এবং ৯:৭৪, ৪৯:১৭), যার মধ্যে ইসলামকে একটি দীন, বিশ্বাস, সত্য পথ/জীবনবোধ/দল এবং কল্যাণ বা সুরক্ষা বুঝানো হয়েছে। আয়াত নং ৩:১৯, ৩:৮৫, এবং ৫:৩ সমূহে ইসলামকে দীন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দীন মানে বিচার ব্যাবস্থা (১:৪, ২৪:২৫, ৯৫:৭), আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা (২:১৩২, ২:২৫৬, ৩:৭৩, ৬:১৫৯, ৪০:১৪, ১০৯:৬, ১১০:২), শাসন-ব্যবস্থা (২:১৯৩, ২:২১৭, ৫:৩), পূর্ণাংগ জীবন ব্যবস্থা (৫:৩, ৬১:৯)।
ইসলাম কীঃ তার সংজ্ঞা
আল্লাহ তাআলা ইসলামকে খুব সংক্ষেপে বিস্তারিত সংজ্ঞায়িত করেছেন, ইসলাম আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত একমাত্র জীবন-বিধান বা দীন, যার দলীল এসেছে নিচের তিনটি আয়াতে (৩:১৯, ৩:৮৫ এবং ৫:৩),
اِنَّ الدِّیۡنَ عِنۡدَ اللّٰهِ الۡاِسۡلَامُ ۟ وَ مَا اخۡتَلَفَ الَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡكِتٰبَ اِلَّا مِنۡۢ بَعۡدِ مَا جَآءَهُمُ الۡعِلۡمُ بَغۡیًۢا بَیۡنَهُمۡ ؕ وَ مَنۡ یَّكۡفُرۡ بِاٰیٰتِ اللّٰهِ فَاِنَّ اللّٰهَ سَرِیۡعُ الۡحِسَابِ
“নিশ্চয় আল্লাহর নিকট দীন হচ্ছে ইসলাম। আর যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে, তাদের নিকট জ্ঞান আসার পরই তারা মতানৈক্য করেছে, পরস্পর বিদ্বেষবশত। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর আয়াতসমূহের সাথে কুফরী করে, নিশ্চয় আল্লাহ হিসাব গ্রহণে দ্রুত।” (৩:১৯)। আল্লাহর কাছে মনোনীত একমাত্র দীন হলো ইসলাম। আর এই দীন পূর্ণভাবে বর্ণিত হয়েছে আল-কোরআনের আয়াতসমূহে। আল-কোরআন সর্বশেষ আসমানি কিতাব, এর পূর্বে অনেক কিতাব এসেছিল, রাসূল(সা.) এসেছিলেন যারা আল্লাহর দীনের দাওয়াত দিয়েছিলেন। সকল কিতাব তথা ইসলামের মূলনীতি এক এবং অভিন্ন- (আসমান-জমিনের এক এবং একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, পরিচালনাকারী, রক্ষণাবেক্ষণকারী এবং মীমাংসাকারী রাব্বিল আ-লামিনের প্রতি একনিষ্ট সমর্পণ, ইবাদাত এবং আনুগত্য করণ); তবে প্রেক্ষাপট, সক্ষমতা এবং সময় বিবেচনায় আমলে ও আচারে আছে ভিন্নতা। মানব সমাজে পরিবর্তন একটি চিরন্তন বাস্তবতা বা চালিকা। তাই, আমল এবং কৌশলের ক্ষেত্রে পরিবর্তন ছিল মানব ও রিসালাতের ইতিহাসে। সেই বিবেচনায় এসেছে অনেক রাসুল এবং কিতাব এক অভিন্ন লক্ষ্যে।
ইসলাম যেহেতু সার্বজনীন ধর্ম বা ব্যবস্থা, তাই এতে মূলনীতিই প্রথমে বিবেচ্য, আমল বা কর্ম ও আচার নয়। আমল হলো আপেক্ষিক, মূলনীতি বা ঈমান হলো স্থায়ী এবং সার্বজনীন। সুতরাং বিভিন্ন রাসূলের উম্মতদের মধ্যে কোনো বিরোধ বা অনৈক্য বা সরলরেখার বক্রতা থাকার কথা নয়। রাসুলগণ ধর্ম বা দীন প্রচারক, উদ্ভাবক নন। দীন আল্লাহর, আমল এবং হিকমা রাসূলের। তাই, ইসলাম নামক আল্লাহর দীন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নাম ধারণ করেছে তাদের নবী বা গোত্র বিবেচনায়। ইহুদি ধর্ম নাম নিয়েছে ইহুদি জাতি থেকে, খ্রীষ্টান ধর্ম এসেছে নব জেসাস খ্রীষ্ট থেকে। তারা আল্লাহর দীন ইসলামের মৌলিক নীতির পরিবর্তন এনেছিল। তাই এগুলো আল্লাহর দীনের রূপ হারিয়েছে। আর এই ভিন্নতার মূল কারণ হলো মানুষের ইগো বা বিদ্বেষ। তাই, উপরের আয়াতে ইহা পরিস্কার যে, আল্লাহর আয়াত বা জ্ঞান আসার পর মতানৈক্য, বিদ্বেষ এবং কুফুরি করা- ইসলাম তথা দ্বীনের পরিপন্থী। আল্লাহ ফ্যাসাদ, বিদ্বেষ এবং কুফুরি পছন্দ করেন না। এগুলো তাঁর মহান দ্বীনের অংশ নয়। ইসলাম হলো আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত সার্বজনীন জীবন-বিধান যা শৃঙ্খলা যা প্রগতি, মীমাংসা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা করে।
প্রতিটি মানুষের এবং মানবসমাজ বা সম্প্রদায়ের রয়েছে জীবন ধারণের নিজস্ব রীতি, পদ্ধতি, মূল্যবোধ, বিধান যা তার আল্লাহ প্রদত্ত চিন্তা তথা ইচ্ছাশক্তির প্রকাশ। আর তা যুগেযুগে বিবর্তিত হয়েছেঃ সৃষ্টি হয়েছে ভিন্নতার। অন্যদিকে, মানুষ পৃথিবীতে আসে শুণ্য জ্ঞান নিয়ে, এমনকি সে কথাও বলতে পারে না। তাকে দিতে হয় ভাষা শিক্ষা এবং জ্ঞান-প্রদান। তার জন্য আল্লাহ মানুষের জন্য পাঠান শিক্ষক এবং কিতাব- যে শিক্ষা এক আল্লাহর নীতি এবং বিধান প্রতিষ্ঠা করে মানব সমাজে সার্বজনীন সাম্য, শৃঙ্খলা, শাসন ও সাম্য নিশ্চিত করে। মানুষ তার ব্যক্তিত্বে এবং ইগোতে ভিন্ন- সে তার নিজ সত্তা, পরিবার বা সম্প্রদায়ের ইজ্জতের, লাভে চলতে চায়। অধিকন্তু, মানুষ দেখে তার পার্থিব ও ক্ষণিকের লক্ষ্য। মানুষ চায় ভোগ করতে, নিজের প্রবৃত্তিকে সন্তুষ্ট করতে। মানুষের বিবেক-বিবেচনা বা বোধশক্তি আছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষের বোধশক্তি তার প্রবৃত্তির কাছে হারিয়ে যায়। তাই, আল্লাহ মানুষের সার্বিক কল্যাণে তাঁর দীনের বাহিরে অন্য কোনো ধর্ম বা জীবনবিধান মেনে নেন না; তাই যৌক্তিক, যা এসেছে নিচের আয়াতে,
وَ مَنۡ یَّبۡتَغِ غَیۡرَ الۡاِسۡلَامِ دِیۡنًا فَلَنۡ یُّقۡبَلَ مِنۡهُ ۚ وَ هُوَ فِی الۡاٰخِرَۃِ مِنَ الۡخٰسِرِیۡنَ
“আর যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দ্বীন চায় তবে তার কাছ থেকে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (৩:৮৫)। অর্থাৎ, ইসলাম আল্লাহ প্রদত্ত এবং অনুমোদিত একমাত্র জীবিন বিধান। এটা যদি কেউ না মানে তাহলে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে এখানে আল্লাহ বলেননি যে, অন্য দীন অনুসরণ করলে দুনিয়াতেই ক্ষতিগ্রস্থ হবে। মানুষের দীন বা উদ্ভাবিত দীন যে একেবারেই খারাপ তা নয়, বা বুঝানো হয়নি। যেমন পরিশ্রম করে পবিত্র রিজিক অর্জন, সত্য কথা বলা, পিতামাতার সেবা, বিনয়ী বা ভদ্র ব্যবহার করা ইত্যাদি সকল মানব সমাজ অনুসরণ করে বা করার চেষ্টা করে। এগুলো আল্লাহর দীনের অন্তর্ভুক্ত এবং অংশ। কিন্তু আল্লাহ চান পূর্ণ দীন, যার ভিত্তি হলো মানুষের আমিত্ব সমর্পণ- এই ভেবে যে, তার দেহ, জীবন, রিজিক, ভোগ, জ্ঞান বা ক্ষমতা আল্লাহ প্রদত্ত, এর জন্য তাদের আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা একান্তই উচিত; এবং এই ভেবে যে, তার জ্ঞান যথার্থ এবং সম্পূর্ণ নয়, কারণ সে অদৃশ্যকে দেখতে পায় না। অথচ আল্লাহ তাআলা সকল প্রকাশ্য এবং গোপন (অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ) জ্ঞানের অধিকারী; সুতরাং মানুষের অহংকার করার কিছুই নেই। তবে, অন্য দীন অনুসরণকারিদের জন্য (আল্লাহর দীনের সাথে মিলে এমন কর্ম) দুনিয়ার জীবনে অবকাশ রয়েছে, এবং তাদের ভালো কর্মের জন্য দুনিয়াতে প্রতিদান রয়েছে। কিন্তু আখিরাত বা চূড়ান্ত বিচারের দিনে তারা ক্ষতিগ্রস্থ হবে, কারণ তারা অদৃশ্য সত্তা আল্লাহ এবং তার বিচার দিবস আখিরাতে তারা ঈমান আনে না। বলা আবশ্যিক যে আল্লাহর দীনের অবিচ্ছেদ্য এবং কেন্দ্রীয় বিষয় হলো আখিরাত বা মীমাংসা দিবস। সুতরাং, মানুষ নিজেকে যতই মানবিক, জ্ঞানী এবং ক্ষমতাবান মনে করুক, আল্লাহর দীনের মূলনীতি (এক আল্লাহর আনুগত্য এবং তার শেষ বিচার বা আখিরাত) এর উপর ঈমান না আনা পর্যন্ত তাদের দীনকে মেনে নিবেন না, এবং আখিরাতে তাদের কোনো অর্জন থাকবেনা - এটাই তার বিধান যা তিনি মানুষকে বারবার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছেন। অর্থাৎ ইসলাম আখিরাতমুখী দীন, যা দুনিয়াতে কল্যাণ এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্টা করে।
যেহেতু ইসলাম সার্বজনীন, তাই আমলের ক্ষেত্রে এটাকে করা হয়েছে ব্যক্তি এবং পরিস্থিতিবান্ধব, যার প্রমাণ এসেছে নিচের আয়াতে-
حُرِّمَتۡ عَلَیۡكُمُ الۡمَیۡتَۃُ وَ الدَّمُ وَ لَحۡمُ الۡخِنۡزِیۡرِ وَ مَاۤ اُهِلَّ لِغَیۡرِ اللّٰهِ بِهٖ وَ الۡمُنۡخَنِقَۃُ وَ الۡمَوۡقُوۡذَۃُ وَ الۡمُتَرَدِّیَۃُ وَ النَّطِیۡحَۃُ وَ مَاۤ اَكَلَ السَّبُعُ اِلَّا مَا ذَكَّیۡتُمۡ ۟ وَ مَا ذُبِحَ عَلَی النُّصُبِ وَ اَنۡ تَسۡتَقۡسِمُوۡا بِالۡاَزۡلَامِ ؕ ذٰلِكُمۡ فِسۡقٌ ؕ اَلۡیَوۡمَ یَئِسَ الَّذِیۡنَ كَفَرُوۡا مِنۡ دِیۡنِكُمۡ فَلَا تَخۡشَوۡهُمۡ وَ اخۡشَوۡنِ ؕ اَلۡیَوۡمَ اَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِیۡنَكُمۡ وَ اَتۡمَمۡتُ عَلَیۡكُمۡ نِعۡمَتِیۡ وَ رَضِیۡتُ لَكُمُ الۡاِسۡلَامَ دِیۡنًا ؕ فَمَنِ اضۡطُرَّ فِیۡ مَخۡمَصَۃٍ غَیۡرَ مُتَجَانِفٍ لِّاِثۡمٍ ۙ فَاِنَّ اللّٰهَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত ও শূকরের গোশত এবং যা আল্লাহ ভিন্ন কারো নামে যবেহ করা হয়েছে; গলা চিপে মারা জন্তু, প্রহারে মরা জন্তু, উঁচু থেকে পড়ে মরা জন্তু অন্য প্রাণীর শিঙের আঘাতে মরা জন্তু এবং যে জন্তুকে হিংস্র প্রাণী খেয়েছে- তবে যা তোমরা যবেহ করে নিয়েছ তা ছাড়া, আর যা মূর্তি পূঁজার বেদিতে বলি দেয়া হয়েছে এবং জুয়ার তীর দ্বারা বণ্টন করা হয়, এগুলো গুনাহ। যারা কুফরী করেছে, আজ তারা তোমাদের দীনের ব্যাপারে হতাশ হয়ে পড়েছে। সুতরাং তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, বরং আমাকে ভয় কর। আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নিআমত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দীন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে। তবে যে তীব্র ক্ষুধায় বাধ্য হবে, কোন পাপের প্রতি ঝুঁকে নয় (তাকে ক্ষমা করা হবে), নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (৫:৩)। এখানে, আল্লাহর নামে কুরবানী বা যবেহ ছাড়া অন্যভাবে প্রাপ্ত গোশত, আল্লাহ ব্যতীত অন্য ইলাহ বা প্রভুর নামে বলি দেওয়া পশুর গোশত ভক্ষণ এবং পরিশ্রম ছাড়া অর্জিত রিজিক অর্জনকে গুনাহের কাজ মর্মে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ, দীনের অন্যতম মৌলিক বিধান হলো রিজিকের বিধান। তবে, এখানে আল্লাহ মানুষের জন্য দীনকে সহজ করেছেন- তীব্র ক্ষুধায় আক্রান্ত হলে, পাপের বা লোভের বশবর্তী না হয়ে ভক্ষণ করলে আল্লাহ ক্ষমা করার ব্যাপারে অবহিত করছেন। আল্লাহর বিধান হক বা ন্যায্যতার উপর প্রতিষ্ঠিত। যেহেতু তিনি প্রতিটি প্রাণের স্রষ্টা, সুতরাং জীবের প্রাণহরণ আল্লাহর নামে বা অনুমতিতেই হবে- এটাই ন্যায্য।
আর আল্লাহ এই পূর্ণ এবং চূড়ান্ত বিকাশিত দীন যা হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর রিসালাত এবং খেলাফতের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেছেন- তাতে দাখিল হতে নির্দেশ দিয়েছেন, যা বর্ণিত হয়েছে নিচের আয়াতে,
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا ادۡخُلُوۡا فِی السِّلۡمِ كَآفَّۃً ۪ وَ لَا تَتَّبِعُوۡا خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ ؕ اِنَّهٗ لَكُمۡ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ
“হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু।” (২:২০৮)। অর্থাৎ, ইসলামের শুরু হবে ঈমান থেকে এবং দাখিল হতে হবে পূর্ণভাবে। এখানে উল্লেখিত সিলম (سِّلْم) দিয়ে তিনটি বিষয় পরিষ্কার করা হয়েছে- যা আল্লাহর অপরিসীম, অকল্পনীয় এবং অতুলণীয় প্রাজ্ঞতার স্বাক্ষর। প্রথমত ইসলাম ((إِسْلَٰم) একটি সাধারণ ক্রিয়া বিশেষ্য যার ক্রিয়াপদ হচ্ছে আসলামা ((أَسْلَمَ) বা সমর্পণ, অন্যদিকে সিলম (سِّلْم) বা ইসলাম হলো সুনিদৃষ্ট নাম বিশেষ্য বা আল-কোরআনিক বা মোহাম্মদি ইসলাম মর্মে বুঝানো হয়েছে। কারণ আল্লাহর প্রেরিত সকল রাসূলের প্রতি ইসলাম দীনই প্রেরিত হয়েছে। ২য় হচ্ছে, ইসলামে দাখিল হতে হলে আগেই আনতে হবে ঈমান। ৩য় বিষয় হচ্ছে (سِّلْم) শব্দটি উৎপত্তি হয়েছে সালাম (سَلَٰم) এবং সালম (سَّلْم) যাদের অর্থ হলো শান্তি। এই শব্দটি উদ্ভুত হয়েছে সালাম (سَلَم) থেকেও তিনটি অর্থ বা মর্ম বুঝাতে (৪:৯০, ৪:৯১- শান্তি; ১৬:২৮, ১৬:৮৭- সমর্পণ এবং ৩৯:২৯- একনিষ্টতা বা পরম আন্তরিকতার সাথে পূর্ণভাবে ধারণ বা আনুগত্য করা বুঝাতে), যার প্রমাণ রয়েছে নিচের ৫টি আয়াতে,
اِلَّا الَّذِیۡنَ یَصِلُوۡنَ اِلٰی قَوۡمٍۭ بَیۡنَكُمۡ وَ بَیۡنَهُمۡ مِّیۡثَاقٌ اَوۡ جَآءُوۡكُمۡ حَصِرَتۡ صُدُوۡرُهُمۡ اَنۡ یُّقَاتِلُوۡكُمۡ اَوۡ یُقَاتِلُوۡا قَوۡمَهُمۡ ؕ وَ لَوۡ شَآءَ اللّٰهُ لَسَلَّطَهُمۡ عَلَیۡكُمۡ فَلَقٰتَلُوۡكُمۡ ۚ فَاِنِ اعۡتَزَلُوۡكُمۡ فَلَمۡ یُقَاتِلُوۡكُمۡ وَ اَلۡقَوۡا اِلَیۡكُمُ السَّلَمَ ۙ فَمَا جَعَلَ اللّٰهُ لَكُمۡ عَلَیۡهِمۡ سَبِیۡلًا
“তবে (তাদেরকে হত্যা করো না) যারা মিলিত হয় এমন কওমের সাথে, যাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সন্ধিচুক্তি রয়েছে। অথবা তোমাদের কাছে আসে এমন অবস্থায় যে, তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে কিংবা তাদের কওমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে তাদের মন সঙ্কুচিত হয়ে গিয়েছে। আর আল্লাহ চাইলে অবশ্যই তাদেরকে তোমাদের উপর ক্ষমতা দিতে পারতেন। অতঃপর নিশ্চিতরূপে তারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত। অতএব তারা যদি তোমাদের থেকে সরে যায় অতঃপর তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে এবং তোমাদের কাছে শান্তি প্রস্তাব উপস্থাপন করে, তাহলে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাদের বিরুদ্ধে কোন পথ রাখেননি।” (৪:৯০)।
سَتَجِدُوۡنَ اٰخَرِیۡنَ یُرِیۡدُوۡنَ اَنۡ یَّاۡمَنُوۡكُمۡ وَ یَاۡمَنُوۡا قَوۡمَهُمۡ ؕ كُلَّمَا رُدُّوۡۤا اِلَی الۡفِتۡنَۃِ اُرۡكِسُوۡا فِیۡهَا ۚ فَاِنۡ لَّمۡ یَعۡتَزِلُوۡكُمۡ وَ یُلۡقُوۡۤا اِلَیۡكُمُ السَّلَمَ وَ یَكُفُّوۡۤا اَیۡدِیَهُمۡ فَخُذُوۡهُمۡ وَ اقۡتُلُوۡهُمۡ حَیۡثُ ثَقِفۡتُمُوۡهُمۡ ؕ وَ اُولٰٓئِكُمۡ جَعَلۡنَا لَكُمۡ عَلَیۡهِمۡ سُلۡطٰنًا مُّبِیۡنًا
“অচিরেই তোমরা কতক লোককে এমনও পাবে, যারা তোমাদের কাছ থেকেও নিরাপদ থাকতে চায়, তাদের নিজ সম্প্রদায় থেকেও নিরাপদ থাকতে চায়, যখন তাদেরকে ফিতনার দিকে মনোনিবেশ করানো হয় তখন তাতেই জড়িয়ে পড়ে। কাজেই যদি তারা তোমাদের শত্রুতা হতে সরে না যায় এবং তোমাদের নিকট শান্তি প্রস্তাব না করে এবং তাদের হস্ত সংবরণ না করে, তবে তাদেরকে গ্রেফতার কর আর যেখানেই পাও হত্যা কর, এরাই হচ্ছে সেই সব লোক তোমাদেরকে যাদের বিরুদ্ধাচরণের স্পষ্ট অধিকার দিয়েছি।” (৪:৯১)।
الَّذِیۡنَ تَتَوَفّٰىهُمُ الۡمَلٰٓئِكَۃُ ظَالِمِیۡۤ اَنۡفُسِهِمۡ ۪ فَاَلۡقَوُا السَّلَمَ مَا كُنَّا نَعۡمَلُ مِنۡ سُوۡٓءٍ ؕ بَلٰۤی اِنَّ اللّٰهَ عَلِیۡمٌۢ بِمَا كُنۡتُمۡ تَعۡمَلُوۡنَ
“নিজদের উপর যুলমকারী থাকা অবস্থায় ফেরেশতারা যাদের মৃত্যু ঘটাবে। অতঃপর তারা সমর্পণ করে বলবে, ‘আমরা কোন পাপ করতাম না।’ হ্যাঁ, নিশ্চয় তোমরা যা করতে সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক জ্ঞাত।” (১৬:২৮)। (১৬:৮৮)। এখানে পূর্ণ সমর্পণ বা আত্মসমর্পণ করা বুঝানো হয়েছে।
ضَرَبَ اللّٰهُ مَثَلًا رَّجُلًا فِیۡهِ شُرَكَآءُ مُتَشٰكِسُوۡنَ وَ رَجُلًا سَلَمًا لِّرَجُلٍ ؕ هَلۡ یَسۡتَوِیٰنِ مَثَلًا ؕ اَلۡحَمۡدُ لِلّٰهِ ۚ بَلۡ اَكۡثَرُهُمۡ لَا یَعۡلَمُوۡنَ “আল্লাহ একটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন: এক ব্যক্তি যার মনিব অনেক, যারা পরস্পর বিরোধী; এবং আরেক ব্যক্তি, যে এক মনিবের অনুগত, এ দু’জনের অবস্থা কি সমান? সকল প্রশংসা আল্লাহর; কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না।” (৩৯:২৯) । সোবহানাল্লাহ। আল্লাহ তাআলা অতি সংক্ষেপে এক আয়াতে বিস্তারিত এবং পূর্ণ সংজ্ঞা দিয়েছেন সূরা আল-বাকারার ২০৮ নম্বর (২:২০৮) আয়াতে- এক এবং একমাত্র, লা-শারীক আল্লাহর প্রতি একনিষ্টভাবে সমর্পিত হয়ে আল-কোরআন এবং রাসুল (সা.) এর পূর্ণ অনূসরণের মাধ্যমে দুনিয়া এবং আখিরাতে শান্তি লাভ করার জীবনবিধানকেই ইসলাম বলা হয়।
ইসলাম মানুষের দৈহিক ও মানসিক বিশুদ্ধতা, আচরণ এবং আমলের দীন। তবে, এতে মূলনীতি তথা মানসিক পরিশুদ্ধতা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। বলতে গেলে, ইসলামের ভিত্তি হলো মানসিকতা। মানুষের মানসিকতা গড়ে উঠে তার ঈমান বা বিশ্বাস এবং শিক্ষা থেকে, যা তাকে তার করণীয়-বর্জণীয় জানিয়ে দেয় এবং আনুগত্য-অনুসরণ করতে আগ্রহী বা বাধ্য করে তুলে। তাই, ইসলামের জন্য অন্তরের প্রসস্ততা বা কাঠামো অত্যাবশ্যক।
ঈমান বা মূলনীতি প্রোথিত হয় বা থাকে ছদর বা অন্তরে। ইসলামের ভিত্তি হল বিশ্বাস, জ্ঞান, যুক্তি এবং প্রত্যয়। প্রতিটি মানব শিশু জন্ম গ্রহণ করে এমন অবস্থায় যে তার কোন জ্ঞানই থাকে না। সে সব শিখে নেয় ক্রমে ক্রমে। প্রতিটি মানুষের অন্তরে জন্ম নেয় ঈমান বা বিশ্বাস, জ্ঞান এবং বোধশক্তি যা দিয়ে সে কাজ করে। ইসলাম ধারণ করতে প্রয়োজন মনের বা অন্তরের স্মৃতি বা ধারনশক্তি। এই ধারণশক্তির অভাব বা বাধা থাকলে আল্লাহ তা সম্প্রসারণ/উম্মুক্ত করে করে দেন। আল্লাহ অন্তরে দিয়েছেন কলব বা আকল বা বুদ্ধি-বিবেচনা শক্তি যা দ্বারা মানুষ তাঁর এবং স্রষ্টার প্রকৃতিকে বুঝতে পারে। সুতরাং ইসলামে তারাই দাখিল হতে পারে যাদের অন্তরকে আল্লাহ সত্য গ্রহণের জন্য উম্মুক্ত করে দেন, যার প্রমাণ এসেছে নিচের আয়াতে,
فَمَنۡ یُّرِدِ اللّٰهُ اَنۡ یَّهۡدِیَهٗ یَشۡرَحۡ صَدۡرَهٗ لِلۡاِسۡلَامِ ۚ وَ مَنۡ یُّرِدۡ اَنۡ یُّضِلَّهٗ یَجۡعَلۡ صَدۡرَهٗ ضَیِّقًا حَرَجًا كَاَنَّمَا یَصَّعَّدُ فِی السَّمَآءِ ؕ كَذٰلِكَ یَجۡعَلُ اللّٰهُ الرِّجۡسَ عَلَی الَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ ﴾ “সুতরাং যাকে আল্লাহ হিদায়াত করতে চান, ইসলামের জন্য তার বুক উন্মুক্ত/প্রসারিত করে দেন। আর যাকে ভ্রষ্ট করতে চান, তার বুক সঙ্কীর্ণ-সঙ্কুচিত করে দেন, যেন সে আসমানে আরোহণ করছে। এমনিভাবে আল্লাহ অকল্যাণ দেন তাদের উপর, যারা ঈমান আনে না।” (৬:১২৫)। এখানে, উল্লেখিত বুক/অন্তর যার আরবী শব্দ (صَدْر)/সাদর যা প্রসস্ত (شَرَحَ)/শারাহা , এবং সঙ্কুচিত (ضَيِّق)/দায়্যিক ও হারাজ/(حَرَج) সঙ্কুচিত (আশাহত) হতে পারে। শারাহা, দায়্যিক, হারাজ; এই তিনটি শব্দ দিয়েই মন বা সাদরকে প্রসারিত বা সঙ্কুচিত করা বুঝানো হয়েছে আল-কোরআনে। মানুষের অন্তরে থাকে লোভ-লালসা, হিংসা-রাগ ইত্যাদি যা মানুষকে শান্তি স্থাপনে বাধা দেয়। আর এই মন্দ বা দুনিয়াবি দিকগুলোকে পরিবর্তন বা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য দরকার মানষিক শিক্ষা যা ধারণ করতে অন্তরের বা জ্ঞানের প্রসস্ততা থাকতে হয়। এই শারাহ একটি মানসিক প্রক্রিয়া যা আল্লাহ্র প্রদত্ত রুহের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়। তাই, আল্লাহর রাসূলগণ তাঁদের অন্তরের প্রশস্ততার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া চাইতেন। অন্যদিকে, যাদের অন্তরে ইসলাম নেই, তাদের অন্তর এতোটাই সঙ্কুচিত হয়য় যে তারা শুন্যে ভেসে বেড়ায়। প্রথিবী প্রতিটি ভরকেই তার কেন্দ্রের দিকে আকর্ষণ করে, কিন্তু কোন বস্তুর কণা যখন এত ক্ষুদ্র হয় বা এতোটা সংকোচনের চাপে পড়ে তখন বাতাসে বা শুন্যে ভেসে বেড়ায়। তাদের অন্তর তখন আল্লাহ তথা সত্যের জমিনে কোনো স্থান পায় না। মানুষ যখন যুদ্ধে বা জীবন যুদ্ধে হেরে যায়, চারিদিকে বিপদ, হতাশা দেখতে পায়, তখন সে তার মনে বা জমিনে বিচরণ করার কোন ক্ষেত্র খুঁজে পায় না। তখন সে আকাশে উড়ে যেতে চায় বা হারিয়ে যেতে চায়। একই মর্ম ফূটে উঠেছে নিচের আয়াতে,
اَفَمَنۡ شَرَحَ اللّٰهُ صَدۡرَهٗ لِلۡاِسۡلَامِ فَهُوَ عَلٰی نُوۡرٍ مِّنۡ رَّبِّهٖ ؕ فَوَیۡلٌ لِّلۡقٰسِیَۃِ قُلُوۡبُهُمۡ مِّنۡ ذِكۡرِ اللّٰهِ ؕ اُولٰٓئِكَ فِیۡ ضَلٰلٍ مُّبِیۡنٍ
“আল্লাহ ইসলামের জন্য যার বক্ষ খুলে দিয়েছেন ফলে সে তার রবের পক্ষ থেকে নূরের উপর রয়েছে, (সে কি তার সমান, যে এরূপ নয়?) অতএব ধ্বংস সে লোকদের জন্য যাদের হৃদয় কঠিন হয়ে গেছে আল্লাহর স্মরণ থেকে। তারা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে নিপতিত।” (৩৯:২২)। ইসলামের ভিত্তি হলো জ্ঞান/নূর/আলো (نُوۡرٍ), অন্তরের প্রসস্ততা, উদারতা, ধৈর্য ধারণ করার সক্ষমতা। ইসলামের আলো দেখিয়ে দেয় সঠিক পথ, যে পথ বেয়ে শুধু পার্থিব দুনিয়া নয়, পৌঁছা যায় আখিরাত তথা সাত আসমানের উপর প্রতিষ্ঠিত আল্লাহ এবং তাঁর আরশের কাছে।
নিষ্ঠুরতা, গোঁড়ামি, মীমাংসা না করার প্রবনতা ইসলামের নীতি নয়। ইসলাম মানে আল্লাহকে স্মরণ। আল্লাহর স্মরণ মানে আল্লাহর রহমত এবং আলো বা হেদায়েতের মধ্যে বিচরণ। পৃথিবী যেমন তার চারদিকের প্রতিটি বস্তুকণাকে তার অভিকর্ষীয় বল দিয়ে তাঁর কেন্দ্রের দিকে আকর্ষন করে তাকে তার স্পেসে ধরে রাখে, তেমনি আল্লাহর স্মরণ এর মাধ্যমে প্রাপ্ত রহমত এবং আলো মানুষকে আল্লাহর দিকে টেনে রাখে।
ইসলাম কেন? কার জন্য ইসলাম দীন। আল্লাহ কেন মানুষের দীনকে মেনে নেয় নাই। কারণ আল্লাহ আসমান-জমিনের স্রষ্টা, মালিক এবং পালনকর্তা; তিনি সর্বশক্তিমান, প্রকাশ্য এবং গোপন জ্ঞানের অধিকারী; তিনিই সবচেয়ে প্রাজ্ঞ বিধানদাতা এবং মীমাংসাকারী; তিনিই শান্তি এবং কল্যাণকারী। তাই, ইসলাম আল্লাহর কল্যণে নয়, বরং মানুষের কল্যাণে, যা এসেছে নিচের আয়াতে,
یَمُنُّوۡنَ عَلَیۡكَ اَنۡ اَسۡلَمُوۡا ؕ قُلۡ لَّا تَمُنُّوۡا عَلَیَّ اِسۡلَامَكُمۡ ۚ بَلِ اللّٰهُ یَمُنُّ عَلَیۡكُمۡ اَنۡ هَدٰىكُمۡ لِلۡاِیۡمَانِ اِنۡ كُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ
“(তারা মনে করে) ‘তারা ইসলাম গ্রহণ করে তোমাকে ধন্য করেছে’। বল, ‘তোমরা ইসলাম গ্রহণ করে আমাকে ধন্য করেছ মনে করো না’। বরং আল্লাহই তোমাদেরকে ঈমানের দিকে পরিচালিত করে তোমাদেরকে ধন্য করেছেন, তোমরা যদি সত্যবাদী হয়ে থাক’।” (৪৯:১৭)। আর ইসলাম গ্রহণ করা মানে আল্লাহকে ধন্য বা করুণা করা নয়, বরং নিজের কল্যাণ সাধন করা। বরং ইসলাম গ্রহণ করলে মানুষের মধ্যে সত্য-ঈমান প্রোথিত হবে এবং আল্লাহর সাহায্য এবং হেদায়েত প্রাপ্তির মাধ্যমে সফলতার পথে এগুতে পারবে। ঈমান কী শক্তি তা বুঝা যায় পরিবার বা সংসার দেখে। যে পরিবারে মা-বাবা দুজনের মধ্যে ঈমান বা বিশ্বাস কাজ করে না, তাতে কি কল্যাণ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়? পারস্পরিক আস্থা থাকলে যত কষ্ট, আপদ-বিপদ, বাধা আসুক তা পার হওয়া যায় সহজে।
সূরা আস-সফ’এর ৭ নং আয়াতে ইসলামকে সত্য পথ, মত এবং জীবনবোধ হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে। ইসলাম সত্যের উপর প্রতিষ্টিত। ইসলামের মূল হলো এক আল্লাহ সম্পর্কে সত্য জানা ও তাতে বিশ্বাস, সমর্পণ এবং আনুগত্য, যা এসেছে নিচের আয়াতে,
وَ مَنۡ اَظۡلَمُ مِمَّنِ افۡتَرٰی عَلَی اللّٰهِ الۡكَذِبَ وَ هُوَ یُدۡعٰۤی اِلَی الۡاِسۡلَامِ ؕ وَ اللّٰهُ لَا یَهۡدِی الۡقَوۡمَ الظّٰلِمِیۡنَ
“সেই ব্যক্তির চেয়ে অধিক যালিম আর কে? যে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা রচনা করে, অথচ তাকে ইসলামের দিকে আহবান করা হয়। আর আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।” (৬১:৭)। ইসলামের মূল হলো আল্লাহর একক প্রভুত্বে সমর্পণ, যেই প্রভুত্বে রয়েছে হক এবং কল্যাণ। আর এর বাহিরে রয়েছে মিথ্যা, জুলুম, অন্যায্যতা এবং অকল্যাণ। ইসলাম শুধু জ্ঞান নয়, ইহা প্রকৃত সত্য জ্ঞান, সহজ-সরল পথ।
ইসলামে দাখিল হওয়া মানে দুনিয়া এবং আখিরাতে সুরক্ষা পাওয়া; রিজিকের সুরক্ষা, ইজ্জতের সুরক্ষা এবং আযাব থেকে সুরক্ষা। যারা ইসলাম ত্যাগ করে তাঁদের জন্য কোন সাহায্য ও সুরক্ষা নেই। ইসলাম গ্রহণ করলে পাওয়া যায় নিশ্চিত সুরক্ষা। মানুষ ভুল করতে পারে, পরিবর্তন হতে পারে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে। ইসলামে আল্লাহ রেখেছেন তওবার মহান বিধান, যা মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে ইসলামের পথে, যা বর্ণিত হয়েছে নিচের আয়াতে,
یَحۡلِفُوۡنَ بِاللّٰهِ مَا قَالُوۡا ؕ وَ لَقَدۡ قَالُوۡا كَلِمَۃَ الۡكُفۡرِ وَ كَفَرُوۡا بَعۡدَ اِسۡلَامِهِمۡ وَ هَمُّوۡا بِمَا لَمۡ یَنَالُوۡا ۚ وَ مَا نَقَمُوۡۤا اِلَّاۤ اَنۡ اَغۡنٰهُمُ اللّٰهُ وَ رَسُوۡلُهٗ مِنۡ فَضۡلِهٖ ۚ فَاِنۡ یَّتُوۡبُوۡا یَكُ خَیۡرًا لَّهُمۡ ۚ وَ اِنۡ یَّتَوَلَّوۡا یُعَذِّبۡهُمُ اللّٰهُ عَذَابًا اَلِیۡمًا ۙ فِی الدُّنۡیَا وَ الۡاٰخِرَۃِ ۚ وَ مَا لَهُمۡ فِی الۡاَرۡضِ مِنۡ وَّلِیٍّ وَّ لَا نَصِیۡرٍ
“তারা আল্লাহর কসম করে যে, তারা বলেনি, অথচ তারা কুফরী বাক্য বলেছে এবং ইসলাম গ্রহণের পর কুফরী করেছে। আর মনস্থ করেছে এমন কিছুর যা তারা পায়নি। আর তারা একমাত্র এ কারণেই দোষারোপ করেছিল যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তাঁর স্বীয় অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করেছেন। এরপর যদি তারা তাওবা করে, তবে তা হবে তাদের জন্য উত্তম, আর যদি তারা বিমুখ হয়, আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে বেদনাদায়ক আযাব দেবেন, আর তাদের জন্য যমীনে নেই কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী।” (৯:৭৪)। কল্যাণের প্রশ্নে ইসলাম কোনো অপশন নয়, বরং বাধ্যবাধকতা। ইসলাম গ্রহণ করলে কল্যাণ এবং সফলতা। আর সফলতা মানে আল্লাহর কাছে সফলভাবে ইজ্জতের সাথে প্রত্যাবর্তন করা, আর ব্যার্থতা হলো ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তন করা। মানুষকে আল্লাহর নিকট প্রত্যাবর্তন করতেই হবে। এতে কোনো ব্যতিক্রম নেই।
ইসলাম শব্দের সাথে উৎপত্তি বা মর্মার্থ বিবেচনায় সম্পর্ক আছে দুটি শব্দের; (أَسْلَمَ)/আসলামা এবং (سَلَٰم)/সালাম যাদের অর্থ যথাক্রমে ‘সমর্পণ করা’ এবং ‘শান্তি’। এই শব্দগুলোর সাথে ইসলামের সম্পর্ক পরবর্তী অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে, ইনশাআল্লাহ।
Categories List
Recent Posts
- January 17, 2026
- November 18, 2025
- November 5, 2025
Nice article. Learn many new things.